বাড়ি সর্বশেষ গান তো গানই ভিডিওর দরকারটা কী?

গান তো গানই ভিডিওর দরকারটা কী?

11
0


সৈয়দ আবদুল হাদী। এই নামের পাশে কোনো উপমাই যথেষ্ট নয়। দরাজ কণ্ঠ আর বৈচিত্র্যময় গায়কী দিয়ে তিনি জয় করে নিয়েছেন কোটি মানুষের হৃদয়। কালজয়ী হয়েছে তার গাওয়া অসংখ্য গান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার গাওয়া গান কণ্ঠে ধারণ করে সংগীতের সিঁড়ি ভাঙতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। ৭৮ বছর বয়সেও তিনি তরুণের মতোই গাইছেন। প্লেব্যাক সাম্রাজ্যের একসময়ের একচ্ছত্র অধিপতি সৈয়দ আবদুল হাদী শ্রেষ্ঠ গায়ক হিসেবে পাঁচবার অর্জন করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এই কণ্ঠরাজের মুখোমুখি হয়েছিলেন আপন তারিক।
হাল সময়ের লেবেল কোম্পানিকেন্দ্রিক গান নিয়ে অনেকেই নেতিবাচক মন্তব্য করছেন। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
আসলে গান তো গানই। মিউজিককে সাপোর্ট করার জন্য কোনো কিছুর দরকার হয় বলে আমি মনে করি না। আমার গানে যদি কোনো দুর্বলতা থাকে আর সেই দুর্বলতাকে ঢাকার জন্য মিউজিক ভিডিওর দরকার। কই এত বছর ধরে যে গান পপুলার হচ্ছিল তার কি ভিডিওর কোনো প্রয়োজন ছিল? এখন আসলে এসব ভিডিও পুরো জিনিসটাই হয়ে গেছে এন্টারটেইনমেন্ট।
এটা কি যুগের চাহিদা নয়?
সেই প্রসঙ্গে আসছি। তবে তার আগে মাইকেল জ্যাকসনের নামটা নিতে চাই। আর্টিস্ট হিসেবে তো তিনি অতুলনীয়। অসাধারণ আর্টিস্ট। কিন্তু তিনিও এন্টারটেইনার হয়ে গিয়েছিলেন। নানা রকম ভিডিও তৈরি করে নিজেকে ভিন্নভাবে দেখাতে গিয়েছিলেন। এটার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তিনি অসাধারণ আর্টিস্টই ছিলেন। কিন্তু নিজের পথে না হেঁটে অন্য পথ বেছে নিলেন। এজন্যই তাকে কিং অব এন্টারটেইনমেন্ট বলা হয়। কিং অব আর্টিস্ট কিন্তু বলা হয় না। এই পার্থক্যটা বুঝতে হবে।
কিন্তু এসব কিছু তো আটকানো যাবে না…
না, এসব আটকানোর প্রশ্নই আসে না। এটা সময়ের গতির সঙ্গে চলতেই থাকবে। তবে যেটা দুঃখজনক সেটা হচ্ছে আর্ট থেকে আমরা এন্টারটেইনমেন্টে চলে গেছি। আর্টের মধ্যেও এন্টারটেইনমেন্ট আছে। তবে এখন অত্যন্ত স্থূল বিনোদন হচ্ছে।
তাহলে আমরা যাচ্ছি কোথায়?
না, অশনিসঙ্কেত নয়, আমি এটাকে বলি স্বাভাবিক গতি। এটা চলতেই থাকবে। শুধু সঙ্গীতেই নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই এমনটা চলছে। অগ্রগতিই বলি আর অধঃগতিই বলি- এটা চলবেই। আর মানুষের চিন্তাও তো এক জায়গায় বসে থাকে না। ভবিষ্যতে যে কী হবে আমরা তার কিছুই জানি না।
টানা ৫৭ বছরেরও বেশি সঙ্গীত জীবন আপনার। কত কিছুই তো দেখেছেন। আপনার কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্পটা অনেকের জানা। তারপরও না বলা কোনো কথা কি আছে?
আসলে সবই বলা হয়েছে প্রায়। তবে একটা কথা বলতে চাই- সেই ছোটবেলায় সঙ্গীত শিল্পী হব, এমন কোনো অ্যাম্বিশন ছিল না। আমি নেশা থেকেই গান গাইতাম। সেই নেশা থেকে গাইতে গাইতে কখন যে পেশা হিসেবে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। আমার বাবা শখে গান গাইতেন। পেশাদার গায়ক তো আর ছিলেন না! তিনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। অবসর সময় গান করতেন। চমৎকার গানের গলা ছিল।
চলচ্চিত্রে প্রথম গানটি রেকর্ডিং করতে গিয়ে নাকি ৯০ বার গাইতে হয়েছে আপনার?
হ্যাঁ, এটা ঠিক। তখন যেভাবে রেকর্ডিং হতো সেটা এখন কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে গান সবকিছু একসঙ্গে হতো। দেখা যেত গানের সঙ্গে অন্তত ২০ জন মানুষ জড়িয়ে আছে একসঙ্গে। সেই ২০ জনের যেকোনো একজন একেবারে গান শেষ হয়ে যাচ্ছে- সেই মুহূর্তে কোনো একটা ভুল করে ফেললে তখন আবার শুরু থেকেই গাইতে হতো। যখনই ভুল হতো যে কারও, আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হতো।
ওই সময়টাকে এখন কি আপনি মিস করেন?
অবশ্যই সেই সময়টাকে খুবই মিস করি আমি। ওই যে একসঙ্গে বসে গান করা এটা খুবই মিস করি। আর্টিস্টরা সবাই মিলে একটা পরিবারের মতো ছিলাম আমরা। এখন তো ধীরে ধীরে সব বিছিন্ন হয়ে গেছে। আসলে প্রতিটি মানুষই এখন একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো।
সেই সময়টাতে একটা গানের জন্য অনেক বেশি পরিশ্রমও করতে হয়েছে আপনাদের…
সত্য, আসলেই তখন সম্পূর্ণভাবে নিজের গলার ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে। কোনো যন্ত্রের সাহায্য পাইনি তখন। এটা একদিক থেকে ভালো ছিল, আমাদের স্বকীয়তা ছিল। এখন তো যন্ত্রনির্ভর সবকিছু। এখন সব একই! মনে হয় একই গান শুনছি!
১৯৬০ থেকে শুরু করেছিলেন আপনি, তখন বিনোদন জগতের পরিবেশটা কেমন ছিল? এখনকার সঙ্গে মেলাতে পারেন?
তখনকার আর বর্তমান সময়ের মধ্যে রাত-দিন পার্থক্য। তখন চলচ্চিত্র বলুন, সঙ্গীত বলুন, সবকিছুই যারা চর্চা করতেন, যারা এই জগতে আসতেন- তাদের সবার মধ্যেই ছিল, আমি শিল্প চর্চা করব। তাদের সবার উদ্দেশ্যই থাকত ভালো কিছু দেশকে উপহার দেওয়া। আর এখন পুরো জিনিসটাই উল্টে গেছে। এখন গান, চলচ্চিত্র, শিল্প চর্চা যেন কোনো ব্যাপারই নয়। এখন যেকোনো মূল্যেই হোক এন্টারটেইন করার একটা স্থূল চেষ্টা থাকে। কী হচ্ছে, কী করছে- এটা না ভেবে মানুষকে বিনোদন দিতে পারলেই যেন হলো!
এখন তো জনপ্রিয়তার সঙ্গে অর্থও আসছে…
অথচ আমাদের সময়ে শিল্পী মানেই ছিল দুস্থ অবস্থায় মারা যাওয়া। পয়সা-কড়ির সঙ্গে শিল্পীর কোনো সম্পর্কই ছিল না। আমার নিজের কথাই বলি, প্রথম গান গেয়ে টাকা পেয়ে দারুণ বিস্মিত হয়েছিলাম। গাই গাইব এর জন্য আবার টাকা কিসের? তখন আমি ছাত্র। একটা অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর তারা যখন আমার হাতে কিছু টাকা দিলেন, তখন তো আমি আকাশ থেকে পড়লাম। গান গাইলাম, মানুষ শুনল, এর জন্য আবার টাকা-পয়সা কেন! আসলে যতই এই শিল্পের সঙ্গে অর্থের সংযোগ বাড়ছে, ততই শিল্প তার শৈল্পিক সুষমা হারাচ্ছে!
এই যে সুদীর্ঘ সময় ধরে গেয়ে যাচ্ছেন। অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। কীভাবে সেই ভরাট কণ্ঠ-মাধুর্য আর ইমেজটা ধরে রাখলেন?
এটা কেন পেরেছি জানি না। তবে সবসময়ই আমি একটা ডিসিপ্লিন লাইফ কাটিয়েছি। শিল্পী হলেই যে উশৃঙ্খল হতে হবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না। যতটুকু সম্ভব নিয়মের মধ্য থেকেই পথ চলতে চেষ্টা করেছি।
পথ চলতে গিয়ে কি কখনো ক্লান্তি ভর করেনি…
মাঝে মাঝে অবশ্যই ক্লান্ত মনে হয়। তারপর আবার এটাও ঠিক, এখনও অনেক কিছুই বাকি আছে করার। এই প্রেরণাটাই বাঁচিয়ে রেখেছে এখনও। আমি যদি এই কিছু করার তাগিদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, তাহলে হয়তো বাঁচব না।
এখন যে গানগুলো হচ্ছে, প্লেব্যাকে যারা গাইছেন, সেসব শোনেন তো?
হ্যাঁ, অবশ্যই শুনি। কী হচ্ছে না হচ্ছে, সব আমি শুনছি। গান কোন দিকে যাচ্ছে না যাচ্ছে এসব নিয়ে আমি চিন্তা করি না। এটা তার স্বাভাবিক গতিতে চলছে।
আপনার পরবর্তী প্রজন্মে ভরাট কণ্ঠ সেভাবে প্লেব্যাক আর আধুনিক গানে আসেনি…
না, সেভাবে ভাবা ঠিক হবে না। আমি নিজেই তো একবার গায়ক আসিফ আকবরের কথা বলেছিলাম। ওর কণ্ঠের মধ্যে আমাদের সময়কার কণ্ঠের যে ধরন, আসিফের কণ্ঠটা তেমনই। অনেক দিন পর একটা ভরাট কণ্ঠ শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। এমন কণ্ঠ তো আজকাল আর হয় না। আজকাল তো মিনমিনে কণ্ঠ। পুরুষ মানুষের এমন দরাজ কণ্ঠই হবে।
আপনার ক্যারিয়ারে অর্জনের শেষ নেই। তারপরও জীবনের ৭৮ বছর বয়সে এসে এমন কিছু অপূর্ণতা কি আছে, যা আপনাকে আক্ষেপে পোড়ায়, দুঃখ দেয়?
না, আমার জীবনে এমন কোনো আক্ষেপ নেই। আমি মনে করি, যতটুকু করেছি, যতটুকু পেয়েছি এটারই প্রাপ্য ছিলাম হয়ত। খুব স্বাভাবিকভাবেই এসব পেয়েছি আমি। এজন্য কখনই অতীতে কাতর হয়ে চোখ রাখি না আমি। সাধারণভাবে জীবনে যা এসেছে তাই আমি সাদরে গ্রহণ করেছি।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here