বাড়ি সর্বশেষ শাকিবের জন্য লোকসান হচ্ছে প্রযোজকের : দেলোয়ার জাহান ঝন্টু

শাকিবের জন্য লোকসান হচ্ছে প্রযোজকের : দেলোয়ার জাহান ঝন্টু

10
0


দেলোয়ার জাহান ঝন্টু। হাল সিনেমার অভিভাবকদের একজন। একাধারে প্রযোজক, পরিচালক, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার। দেশীয় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে উপহার দিয়েছেন শতাধিক অভিনেতা, অভিনেত্রী, কলাকুশলী। সিনেমা মুক্তির সংখ্যাতত্ত্বের হিসাবে (এ পর্যন্ত তার পরিচালিত ৬৪টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে) তিনিই নাম্বার ওয়ান। এফডিসির পরিচালক সমিতিতে দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর মুখোমুখি হয়েছিলেন আলিনা তাবাসসুম।
অনেকেই বলছেন আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এখন কোমায়। আপনি কি মনে করেন?
কথাটি সত্য। আমাদের সিনেমার বর্তমান দশা খুবই করুণ। সাধারণ মানুষ একবার যদি কোনো কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে আর সেদিকে ফিরেও তাকায় না। আমরা সিনেমা হল থেকে দর্শকদের ফিরিয়ে দিয়েছি। তারাও সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সুতরাং তাদের আবারও সিনেমা হলমুখী করা সম্ভব নয়।
এই অবস্থার জন্য কোন বিষয়টিকে দায়ী করবেন?
আমার দৃষ্টিতে একটিমাত্র বড় বিষয়। আর তা হচ্ছে সিনেমার গল্প। আমাদের দেশে ভালো গল্পের সিনেমা হচ্ছে না। একটি ভালো গল্পই কিন্তু একজন দর্শকের মুখ থেকে ‘একটি ভালো সিনেমা দেখলাম’ এই শব্দটি বের করে। ওই গল্পই কিন্তু পরিচালকের সুন্দর উপস্থাপনার কারণে দর্শককে তিন ঘণ্টা বসিয়ে রাখে আর সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে সিনেমাটির প্রশংসা করে। সুতরাং গল্পই যদি না থাকে তাহলে দর্শককে সিনেমা হলে আনবেন কী করে।
শিল্পী সঙ্কটের কথা অনেকেই বলেন। আপনার মত কী?
বাজে কথা। শিল্পী পরিচালক তৈরি করে নিতে পারে। দরকার গল্প আর চিত্রনাট্য। আমি একটি নতুন ছেলেকে নিলাম। সে হয়ত নায়ক আলমগীরের মতো অভিনয় করতে পারবে না। কিন্তু আমি যতটুকু পারি শিখিয়ে পড়িয়ে তাকে একটি পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারব। যদি গল্পটি ভালো হয়, তাহলে এই যেনতেন মার্কা অভিনেতা দিয়েও দর্শকের বাহবা পাওয়া যাবে।
গল্পের অভাবের কারণ হিসেবে অনেকে সেন্সর বোর্ডকেও দায়ী করে?
এটাও আমি মানব না। সেন্সর বোর্ড আগেও অনেক কঠোর ছিল। এখন বরং অনেক শিথিল। সেন্সর বোর্ড কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। একটি গল্প নিয়ে আমরা যেভাবে সিনিয়র জুনিয়রদের কাছে ছুটে যেতাম, আলোচনা করতাম, বারবার সিটিং দিতাম, এখন সেটা নেই। এখন বেশিরভাগ পরিচালক বা কাহিনীকারই ‘সব জান্তা শমসের’। তারা মনে করে, তারা যেটা বোঝে তারচেয়ে বেশি কেউ বোঝে না। আমার সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও খান আতাউর রহমান, কামাল আহমেদ আমার কাছ থেকে সিনেমার গল্পের পরামর্শ নিতেন। তাতে তারা ছোট হননি। বরং সম্মানিত হয়েছেন। আমার লেখা কাহিনী কামাল আহমেদ সাহেব সৈয়দ শামসুল হককে দেখাতে বলেছেন। আমি গিয়েছি, দেখিয়েছি। হক সাহেব আবার উদয়ন চৌধুরীকে দেখাতে বললেন, আমি তাও করলাম। শেষ পর্যন্ত কিন্তু গল্পটি এমন দাঁড়াল যে, সিনেমা সুপার ডুপার হিট।
সিনেমার হাল অবস্থার জন্য অনেকে জাজ মাল্টিমিডিয়াকে দায়ী করছেন-
একদমই না। জাজ সব কাজই ভালো করছে, শুধু একটি কাজ ছাড়া। আর সেটা হলো সিনেমা হলে তারা যে মেশিন বসিয়েছে সেটার ভাড়া নিচ্ছে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার প্রযোজকের কাছ থেকে। এটা নেওয়া উচিত ছিল সিনেমা হল মালিকের কাছ থেকে। আমি তাদের অনুরোধ করব, নতুন করে বিষয়টি নিয়ে ভাবার এবং দয়া করে মেশিন ভাড়াটি প্রযোজক নয়, প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের কাছ থেকে নিন। এর বাইরে জাজ নিয়মিত সিনেমা নির্মাণ করছে। আমাদের অনেক কলা-কুশলীকে বেকারত্বের হাত থেকে রক্ষা করছে। কাজ করলে কিছু ভুলত্রুটি হবেই। সেটাকে মাথায় না রেখে তাদের কাজের পক্ষেই থাকা উচিত সবার।
কেউ কেউ বলছেন সিনিয়র পরিচালকরা এখনকার ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত নন বলে বেকার বসে আছেন-
একজন পরিচালকের কাছে প্রযুক্তি কোনো বিষয় নয়। তরুণরা আসছে এটা ভালো লক্ষণ। আমি সাধুবাদ জানাই। আজ আপনি যেমন আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, তেমনি দশ বছর পর হয়ত অন্য কেউ অন্য কোনো ঝন্টুর সাক্ষাৎকার নেবে। এটাই নিয়ম। একজন পরিচালকের কাজ কী? তিনি তার গল্পটাকে সুন্দর করে দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে একটি সিনেমা বানাবে। প্রযুক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? তার প্রয়োজন প্রযুক্তি বোঝে এমন একজন চিত্রগ্রাহক। পরিচালক ক্যামেরাম্যানকে বুঝিয়ে দেবেন তিনি কী চাচ্ছেন। ক্যামেরাম্যান সেটাই ধারণ করবেন। প্রযুক্তি জানা একজন সম্পাদক নেবেন, যিনি সম্পাদনা করে দেবেন। এখানে পরিচালককে প্রযুক্তির ফ্যারে ফেলে বেকার বানানোর কোনো অর্থ হয় না।
শাকিব খান সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?
বাংলাদেশের এক নাম্বার নায়ক। সুদর্শন, ভালো অভিনয় করে আর দর্শকগ্রহণযোগ্যতা মারাত্মক। কিন্তু এটাও বলতে হবে, আজ যে সিনেমা শিল্পের নাজুক অবস্থা তার জন্য শাকিব খান অনেকাংশে দায়ী। একটি সিনেমার বাজেট যদি হয় এক কোটি টাকা। তাহলে শাকিব খানকে নিয়ে কাজ করলে সেই বাজেট গিয়ে দাঁড়ায় দুই কোটি টাকা। দুপুর দেড়টায় শুটিংয়ে আসে, সন্ধ্যায় চলে যায়। আবার টানা শিডিউল দেওয়া থাকলেও নতুন কোনো সিনেমা পেলে শিডিউলে ঘাপলা করে। একটি সিনেমার শুটিং যদি ৪০ শিফটে শেষ হওয়ার কথা থাকে, শাকিব খান থাকলে সেটা শেষ হবে ৮০ শিফটে। বাজেট চলে যাবে দ্বিগুণে। ছবি মুক্তির পর দেড় কোটি টাকা ফেরৎ পেলেও বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয় প্রযোজককে। নতুন করে সিনেমা বানানোর আগ্রহ আর থাকে না প্রযোজকের। যে কারণে প্রযোজক কমে গেছে অনেক। গোটা শিল্পে নেমে এসেছে স্থবিরতা।
নায়িকাদের মধ্যে কাকে আপনি সম্ভাবনার তালিকায় রাখবেন?
সত্যি কথা বলতে কি, আমার কাছে এখনকার একটি নায়িকাকে পরিপূর্ণ মনে হয়েছে। সে হলো পরীমনি। একজন নায়িকাকে আগে দেখতে সুন্দর হতে হবে, তার শারীরিক গড়ন হতে হবে আকর্ষণীয়। পরীমনির মধ্যে আমি তার শতভাগ দেখেছি। আমি নিজেও তাকে নিয়ে একটি সিনেমা তৈরি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সিনেমাটি আর হয়নি।
পরীমনির অনেক ছবি মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু বাণিজ্যিক সফলতা তেমন নেই-
এটা পরীমনির দোষ নয়। আমাদের পরিচালকরা তাকে ব্যবহার করতে পারেননি। যেসব পরিচালকের সিনেমায় পরীমনি কাজ করেছে তাদের সেই দক্ষতা নেই। তা না হলে মৌসুমী, শাবনূর যেমন চমৎকার জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল পরীমনিও তা পারত।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here